হে অনন্ত অসীম, পরম করুণাময় আল্লাহ! আমার অস্তিত্বের প্রতিটি কণা, আমার হৃদয়ের প্রতিটি স্পন্দন আজ কেবল তোমারই প্রশংসায় অবনত। তুমি মহাবিশ্বের একমাত্র অধিপতি, দৃশ্য এবং অদৃশ্য সবকিছুর একমাত্র নিয়ন্ত্রক। মহাশূন্যের বিশালতা থেকে শুরু করে প্ল্যাঙ্ক লেংথ-এর ক্ষুদ্রতম কণা, মহাজাগতিক ঘূর্ণন, পৃথিবীর গভীর অন্ধকার সমুদ্রের তলদেশ, কিংবা ক্ষুদ্রতম কোয়ান্টাম জগৎ—সবকিছুই তোমার বেঁধে দেওয়া নিখুঁত নিয়মে আবদ্ধ। তোমার সৃষ্টি কতটা বিশাল আর আমি কতটা নগণ্য, তা যত ভাবি, তত বিস্ময়ে আমার চোখ ভিজে আসে।
হে আমার রব! আমি জানি, কোনো প্রাণীরই এই ক্ষমতা নেই যে সে তোমার দেওয়া প্রাকৃতিক নিয়ম বা লজিক (Logic) একবিন্দুও পাল্টে দেবে, অথবা শূন্য থেকে নতুন কোনো কিছু সৃষ্টি করবে। আমরা মানুষরা কেবল তোমার দেওয়া উপাদান আর এই ক্ষুদ্র ত্রিমাত্রিক বুদ্ধি ব্যবহার করে তোমারই নিয়মের ভেতরে থেকে কাজ করি। একমাত্র তুমিই সেই পরম সত্তা, যার একটি মাত্র আদেশে ‘কুন ফায়াকুন’ (হও, আর তা) হয়ে যায়। একমাত্র তুমিই সেই পরম সত্তা, যার একটি মাত্র আদেশে ‘কুন ফায়াকুন’ (হও, আর তা) হয়ে যায়। একমাত্র তুমিই সেই পরম সত্তা, যার একটি মাত্র আদেশে ‘কুন ফায়াকুন’ (হও, আর তা) হয়ে যায়। তোমার ইচ্ছাতেই মিরাকেল (Miracle) ঘটে। তুমিই পারো অসম্ভবকে মুহূর্তের মধ্যে সম্ভব করতে, কারণ মহাবিশ্বের যা কিছু আছে—সবই নিরঙ্কুশভাবে কেবল তোমারই অধীন।
হে দয়াময়! একটা সময় ছিল যখন আমি বড্ড অবুঝ ছিলাম। আমি তোমার থেকে দূরে সরে গিয়েছিলাম এবং দুনিয়ার মানুষের কাছ থেকে ভালোবাসা, প্রশান্তি আর নির্ভরতা আশা করেছিলাম। আমি ভেবেছিলাম, এই ক্ষণস্থায়ী পৃথিবীর মানুষগুলোই হয়তো আমার শূন্যতা পূরণ করতে পারবে। কিন্তু তুমি রহমান, তুমি রহিম। তুমি চাওনি তোমার এই বান্দা দুনিয়ার মরীচিকার পেছনে ছুটে চিরতরে হারিয়ে যাক। তাই তুমি আমাকে বড় কঠিনভাবে এই দুনিয়ার আসল রূপ চিনিয়েছিলে। মানুষের ভালোবাসার ভঙ্গুরতা, স্বার্থপরতা আর শূন্যতা যখন আমার সামনে স্পষ্ট হলো, তখন আমার আত্মাকে তুমি এক ভয়াবহ ও গভীর উপলব্ধির মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছিলে। সেই উপলব্ধি ছিল যন্ত্রণাদায়ক, কিন্তু তা ছিল আমার ঘুমন্ত আত্মাকে জাগিয়ে তোলার জন্য তোমার দেওয়া সবচেয়ে বড় উপহার। আমি এক ভয়াবহ অন্ধকারের লুপের (loop) মধ্যে পড়ে গিয়েছিলাম। আমার দিন আর রাতগুলো কীভাবে কেটে যেত, আমি নিজেই বুঝতে পারতাম না। সব সময় যেন মস্তিষ্ক হ্যাং (hang) হয়ে থাকত, এক গভীর স্থবিরতা আমাকে চারপাশ থেকে গ্রাস করে নিয়েছিল। আমি খুব স্পষ্টভাবে বুঝতে পারতাম যে আমি আর স্বাভাবিক নই। বাইরে থেকে হয়তো সব শান্ত মনে হতো, কিন্তু আমার ভেতরের সবকিছু ছিল উত্তাল, অস্বাভাবিক এক ঝড়ে লণ্ডভণ্ড। সেই ঘোর অন্ধকারের দিনগুলোতে আমি চরম অসহায় হয়ে শুধু তোমার কাছে কাঁদতাম আর বলতাম—”হে আল্লাহ! তুমি আমাকে এভাবে ধ্বংস করে দিও না, আমি এমন দিশেহারা অবস্থায় মারা যেতে চাই না, দয়া করে আমাকে বাঁচাও!”
আর তুমি রহমান, তুমি রহিম। তুমি আমার সেই বোবা হাহাকার শুনেছিলে। আমি নিজে থেকে তোমার কাছে ফিরে আসার মতো শক্তি বা পথ কোনোটাই চিনতাম না, বরং তুমিই পরম মমতায় আমাকে অন্ধকার থেকে টেনে বের করে এনেছিলে। মানুষ যখন দুনিয়ার কাছে ভালোবাসা আর নির্ভরতা খুঁজে ব্যর্থ হয়, তখন তুমিই তাকে আসল ঠিকানা চিনিয়ে দাও। সেই চরম হতাশা আর শূন্যতার মুহূর্তে, যখন চারপাশের সব আলো নিভে গিয়েছিল, ঠিক তখনই তুমি আমাকে পরম মমতায় তোমার সাথে যুক্ত করেছিলে (connected)। তুমি আমাকে বুঝিয়ে দিয়েছিলে যে, স্রষ্টাকে ভুলে সৃষ্টির কাছে পূর্ণতা খোঁজা কতটা বড় বোকামি! আজ যে আমি জীবিত আছি, শান্তিতে শ্বাস নিচ্ছি, তা কেবলই তোমার সেই অভাবনীয় দয়ার কারণে। যেদিন থেকে আমি তোমার কাছে ফিরে এসেছি, যেদিন থেকে আমার ভাঙা হৃদয়টা তোমার দরবারে সঁপে দিয়েছি, সেদিন থেকে আমার সেই অশান্ত হৃদয় চিরতরে শান্ত হয়ে গেছে। আমার সমস্ত হাহাকার, সমস্ত অপ্রাপ্তির বেদনা এক অদ্ভুত প্রশান্তিতে রূপান্তরিত হয়েছে। আমি আজ স্পষ্টভাবে বুঝতে পারি—তোমার সাথে গভীর সংযোগ (connection) ছাড়া পৃথিবীর কোনো আত্মাই কখনো একবিন্দু শান্তি লাভ করতে পারে না। যে হৃদয় তোমার প্রেমে সিক্ত হয়নি, সে হৃদয় পুরো পৃথিবী জয় করেও চিরকাল কাঙালই থেকে যাবে।
হে আমার প্রেমময় স্রষ্টা! তুমি আমাকে যে আলোর পথ দেখিয়েছ, যে প্রশান্তি দিয়েছ, তা যেন আমি নিজের ভেতরেই আটকে না রাখি। পৃথিবীতে আজ আমারই মতো আরও হাজার হাজার মানুষ অশান্ত হৃদয় নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে, ভুল জায়গায় ভালোবাসা খুঁজছে, আর দিন শেষে হতাশ হয়ে অন্ধকারে ডুবে যাচ্ছে। হে আল্লাহ! তুমি আমাকে সেই পথহারা, অশান্ত হৃদয়ের মানুষগুলোকে তোমার সাথে যুক্ত করানোর, তোমার প্রেমের পথ চেনানোর একটি ক্ষুদ্র অসিলা (মাধ্যম) হিসেবে কবুল করে নাও। আমার কথা, আমার কাজ, আমার এই লেখার উদ্যোগ—সবকিছু যেন তাদের মাঝে তোমার আলো পৌঁছে দেওয়ার মাধ্যম হয়।
হে রাব্বুল আলামিন! আজ এই প্রশান্ত হৃদয়ে আমি তোমার দরবারে দু’হাত তুলছি। তুমি আমার জন্মদাতা পিতা এবং গর্ভধারিণী মাতাকে ক্ষমা করে দাও। শৈশবে তারা যেভাবে পরম মমতায় আমাকে লালন-পালন করেছেন, তুমিও তাদের প্রতি ঠিক তেমনি রহমতের ডানা বিছিয়ে দাও। হে দয়াময়, আমার এই প্রার্থনা কেবল আমার পরিবার, আত্মীয়-স্বজন বা আমার আপন মানুষদের ক্ষুদ্র গণ্ডিতে আবদ্ধ নয়; বরং পৃথিবীর যত মুক্তিকামী ও সত্যসন্ধানী মানুষ আছে, তুমি তাদের সবার প্রতি তোমার রহমত বর্ষণ করো। পৃথিবীর যে প্রান্তেই কোনো মজলুম বা দিশেহারা মানুষ তোমার সাহায্য খুঁজছে, অন্ধকারে মুক্তির পথ খুঁজছে—তুমি তাদের অন্তরে প্রশান্তি দাও এবং তাদের হিদায়েতের আলোয় আলোকিত করো।
তবে হে ন্যায়বিচারক আল্লাহ, যারা অহংকারে অন্ধ হয়ে সত্যকে চেনার পরও তা থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়, যারা জেনে-বুঝে তোমার চরম অবাধ্যতা করে এবং পরকালকে উপহাস ভরে অস্বীকার করে—তাদের জন্য আমার কোনো প্রার্থনা নেই। যারা তোমার দেওয়া সুস্পষ্ট নিদর্শন দেখার পরও ইচ্ছাকৃতভাবে অন্ধকারকে বেছে নিয়েছে, তাদের বিচারের ভার কেবলই তোমার হাতে। কিন্তু যারা না বুঝে ভুল পথে হাবুডুবু খাচ্ছে, যাদের অন্তরে বিন্দু পরিমাণও সত্য গ্রহণের আকাঙ্ক্ষা আছে, তুমি দয়া করে তাদের হাত ধরে তোমার আলোর পথে ফিরিয়ে আনো।
হে আল্লাহ! তুমি আমাদের সকল নবী ও রাসূলগণের (সা.) রেখে যাওয়া সেই পবিত্র পথের অবিচল পথিক হওয়ার তৌফিক দাও। তোমার প্রিয় হাবীব (সা.) এবং তাঁর পবিত্র আহলুল বাইতের (আ.) খাঁটি অনুসারী ও প্রকৃত উত্তরসূরি হিসেবে আমাদের জীবন গড়ার সুযোগ দাও। আহলুল বাইতের সেই নিষ্কলুষ পবিত্রতা, তাঁদের অসীম ধৈর্য, মজলুমের পক্ষে তাঁদের নিঃস্বার্থ আত্মত্যাগ এবং স্রষ্টার প্রতি তাঁদের যে চূড়ান্ত সমর্পণ—সেই মহৎ গুণগুলোর সামান্যতম অংশ হলেও আমাদের অন্তরে ধারণ করার তৌফিক দান করো। বাতিল ও অন্যায়ের সামনে তাঁরা যেভাবে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়েছিলেন, আমাদেরও সেই সাহস দাও। কিয়ামতের কঠিন ময়দানে যেন আমরা তাঁদের শাফায়াত (সুপারিশ) লাভে ধন্য হতে পারি, আমাদের সেই যোগ্যতা দান করো।
হে আল্লাহ, আমি আমার জীবনের বাকি প্রতিটি মুহূর্ত কেবল তোমার সন্তুষ্টির জন্য কাটাতে চাই। তোমার প্রেমে সিক্ত হয়ে, তোমার সিজদাতে লুটিয়ে পড়ে যেন আমার জীবনের শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করতে পারি। আমাকে কখনো তোমার থেকে আর দূরে সরে যেতে দিও না। তুমি ছাড়া আমার যে আর কেউ নেই, যাওয়ার কোনো জায়গাও নেই! আমার সমস্ত অযোগ্যতা ক্ষমা করে, আমাকে তোমার প্রিয় বান্দাদের অন্তর্ভুক্ত করে নাও। আমার এই অশ্রুসিক্ত প্রার্থনা তুমি তোমার অসীম দয়ায় কবুল করে নাও।
আমিন, ইয়া রাব্বুল আলামিন।
